১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার রূপরেখা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দেশ এখন একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগুচ্ছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি কেবল একটি নির্বাচনের দিন নয়, বরং এটি নাগরিকদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এক উৎসব। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে নতুন বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা।
ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ভোটদান প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে গুরুভার কাঁধে নিয়েছিল, তার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি চূড়ান্ত করেছে, তখন দেশজুড়ে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই নিবন্ধে আমরা ১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি, বিশেষ গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
নির্বাচনের সময়সূচি ও তফসিল একনজরে
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফসিল ঘোষণা করেছেন। এবারের নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
- কার্যক্রম তারিখ ও সময়তফসিল ঘোষণা ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
- মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি ২০২৬
- নির্বাচনী প্রচারণা শেষ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (সকাল ৭:৩০)
- ভোটগ্রহণের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- ভোট গণনা ও ফলাফল ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (রাত থেকে শুরু
এবারের নির্বাচনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ
১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন ও নতুন পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি:
- সাংবিধানিক গণভোট: নির্বাচনের দিনেই ভোটাররা একটি অতিরিক্ত ব্যালটে 'জুলাই সনদ' বা সংবিধান সংস্কারের ওপর তাদের মতামত দেবেন। এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
- উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা: নির্বাচনে জয়ী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি 'উচ্চকক্ষ' গঠিত হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
- প্রবাসীদের ভোটাধিকার: প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
- পোস্টারবিহীন নির্বাচন: পরিবেশ রক্ষায় এবং আধুনিক প্রচারণার অংশ হিসেবে এবারের নির্বাচনে সনাতনী কাগজের পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারণা মূলত ডিজিটাল মাধ্যম ও পথসভার ওপর নির্ভরশীল।
- 'না' ভোট পুনঃপ্রবর্তন: ভোটাররা যদি কোনো প্রার্থীকেই পছন্দ না করেন, তবে তারা ব্যালটে 'না' ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের ফলে নির্বাচনী ময়দানে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটেছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামী পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
- বিএনপি: তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি সারা দেশে ব্যাপক জনসভা ও রোডশো করছে। তারা ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপ নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে।
- জামায়াতে ইসলামী: দলটি বিভিন্ন ছোট রাজনৈতিক দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে তাদের অবস্থান শক্ত করছে।
- নতুন রাজনৈতিক শক্তি: গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবারের নির্বাচনে নতুন চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
- আওয়ামী লীগের অবস্থান: আইনি জটিলতা এবং রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
- নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রায় ১ লক্ষ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এর প্রায় ২০০ জনের একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষক দল সারা দেশে নির্বাচনের স্বচ্ছতা তদারকি করবে।
লেখকের মন্তব্য
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি 'এসিড টেস্ট'। গত এক দশকের নির্বাচনী বিতর্ক কাটিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া বর্তমান কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে এবার ভোটারদের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ, তা আশাব্যঞ্জক। যদি ভয়ভীতিহীন পরিবেশে প্রতিটি নাগরিক তাদের ভোট দিতে পারেন, তবেই এই নির্বাচন সার্থক হবে এবং বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাবে।



জাস্টিফাই ইনফোর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্টের রিভিউ দেওয়া হয়।
comment url